ভোট ডাকাতির উৎসব শেষে মহাজোট ২৮৮, ঐক্যফ্রন্ট ৬ ও স্বতন্ত্র ৪ টি : নিহত ২১

ডিসেম্বর ৩১, ২০১৮ ১১:১২:পূর্বাহ্ণ
ছবি: আহমেদ যাইফ

নিজস্ব প্রতিবেদক: ৩০ ডিসেম্বর একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ভোট ডাকাতির উৎসব শেষ হয়েছে। দলীয় সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে  আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট পেয়েছে ২৮৮ আসন। এদের মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ২৬৬ এবং জাতীয় পার্টি (জাপা) পেয়েছে ২২ আসন। অন্যদিকে বিএনপিকে সাথে নিয়ে গড়া ঐক্যফ্রন্টর ঝুলিতে এসেছে ৬টি আসন। স্বতন্ত্র ৪ টি আসন পেয়েছে।

এদিকে নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ২১ জন।

রবিবার প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ব্যয়ের এই নির্বাচনে ৩৯টি নিবন্ধিত রাজনৈতিক দলের ১৮০০ এর বেশি প্রার্থী অংশগ্রহণ করেছে।

তবে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের লোকদের বিরুদ্ধে ভোট জালিয়াতি ও কেন্দ্র দখলসহ বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ এনে জাতীয় ঐক্যফ্রন্টের ৪৯ জনসহ মোট ৫৭ প্রার্থী রবিবারের নির্বাচন বর্জন করেন। তাদের প্রায় সবাই ভোটের মাঝখানেই প্রতিদ্বন্দ্বীতা থেকে নিজেদের সরিয়ে নেন।

নির্বাচন কমিশন সচিব হেলালুদ্দীন আহমদ জানান, বিভিন্ন অভিযোগে ২২টি কেন্দ্রের ভোটগ্রহণ স্থগিত করা হয়েছে।

২৯৯টি আসনের নির্বাচনে ২৯৮টির বেসরকারি ফল পাওয়া গেছে।

ভোটের আগের দিন রাতেই ‘নৌকা প্রতীকে’ সিল মারা, ধানের শীষের এজেন্টদের কেন্দ্রে ঢুকতে না দেয়া, ভোটারদের ভোট দানে বাধা দেয়া, জাল ভোট, কেন্দ্র দখল, বিভিন্ন কেন্দ্রে সহিংসতা ও নজিরবিহীন কারচুপির মধ্য দিয়ে গতকাল রোববার অনুষ্ঠিত হয়েছে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ভোটগ্রহণ শুরুর সাথে সাথেই ক্ষমতাসীন দলের লোকজন ভোটকেন্দ্রগুলো নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নেয় এবং ধানের শীষের এজেন্টদের কেন্দ্রে প্রবেশ করতে দেয়নি। কিছু সংখ্যক কেন্দ্রে ঢুকলেও পরে তাদেরকে বের করে দেয়া হয়। বিভিন্ন এলাকায় এ নিয়ে তর্ক করলে মারধোর করা হয়। পাল্টা প্রতিবাদ করলে কিছু কিছু স্থানে সহিংসতায় রূপ নেয়। এ নির্বাচনে এ পর্যন্ত ১৬ জনের প্রাণহানির খবর পাওয়া গেছে।
নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ছাড়া সব দলের বেশকিছু প্রার্থী নির্বাচন চলাকালীন সময়ে ভোট বর্জন করেছে। এর মধ্যে ধানের শীষের রয়েছে প্রায় ৫০জন প্রার্থী। এ  ছাড়াও ঢাকার নবাবগঞ্জে স্বতন্ত্র প্রার্থী সালমা ইসলামসহ বেশকিছু স্বতন্ত্র প্রার্থীও রয়েছে। ইসলামী আন্দোলনের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোসাদ্দেক বিল্লাস মাদানীসহ কয়েকজন ভোট বর্জন করেছেন। এ নির্বাচনকে প্রহসন ও তামাসার নির্বাচন হিসেবে আখ্যায়িত করেছে রাজনৈতিক দলগুলো।
গতকাল দুপুর ২টার দিকে বিএনপির যুগ্ম-মহাসচিব সৈয়দ মোয়াজ্জেম হোসেন আলাল ২৯৯টি আসনের মধ্যে ২২১টি আসনে নানা অনিয়মের অভিযোগ দাখিল করেছেন। ভোটগ্রহণের মাঝপথে রোববার দুপুরে কারচুপি, কেন্দ্র দখল ও ধানের শীষ প্রতীকের পোলিং এজেন্টদের বের করে দেওয়ার অভিযোগ নিয়ে আগারগাঁওয়ে নির্বাচন ভবনে যায় বিএনপির একটি প্রতিনিধি দল।
এ সময় আলাল বলেন, এ নির্বাচনে ভোটগ্রহণের নামে ‘তামাশা’ হয়েছে। প্রমাণিত হল যে বাংলাদেশে দলীয় সরকার রেখে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভবপর নয়।
বিএনপি’র লিখিত অভিযোগে বলা হয়, শনিবার রাতে দেড় শতাধিক ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও ভোটগ্রহণ কর্মকর্তাসহ প্রশাসনের সহযোগিতায় ৪০০ থেকে ৫০০ ব্যালট বাক্স ভর্তি করা হয়। নির্বাচন শুরুর আগে প্রায় ২৫০টি আসনের ধানের শীষের প্রতীকের এজেন্টদের বাধা দেয়া হয়েছে।
এ নির্বাচনে ২৯৮টি আসনে প্রার্থী দিয়ে ভোটে অংশ নিয়েছে ইসলামী আন্দোলন। তারা সারাদেশে নির্বাচনের নামে কেন্দ্র দখল, ব্যালট পেপারে সিল মারা, কারচুপি, পোলিং এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া, পুলিশ দিয়ে ভোটার ও প্রার্থীর হামলার ঘটনা ঘটলেও নির্বাচন কমিশন কোনো পদক্ষেপ নেয়নি এমন অভিযোগ করেছে।
এই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে উল্লেখ করে দলের যুগ্ম-মহাসচিব অধ্যাপক এটিএম হেমায়েত উদ্দিন আহমেদ বলেছেন, ‘এক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশন জ্ঞানপাপীর ভূমিকা পালন করেছেন, তবে একজন কমিশনার ছাড়া। সব আসনেই প্রশাসনের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ সহায়তায় হাতপাখা মার্কার প্রার্থীর ওপর হামলা, এজেন্টদের কেন্দ্র থেকে বের করে দেওয়া ও ভোটারদের কাছ থেকে ব্যালট পেপার কেড়ে নিয়ে নৌকা, লাঙ্গল ও সাইকেল মার্কায় ভোট দেওয়া হয়েছে। অধিকাংশ আসনে ভোটারদের ভোট দানে বাধা, পোলিং এজেন্টদের গুম ও পুলিশের অযথা হয়রানি ও গ্রেফতারের ঘটনা ঘটিয়ে নির্বাচনকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।’
সংবাদ সম্মেলনে দেশের প্রায় ২৪টি আসনে সুনির্দিষ্ট অনিয়ম ও ভোট কারচুপির অভিযোগ তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘দেশে নির্বাচনের নামে প্রহসন হয়েছে। এ নির্বাচন জনগণ মেনে নেয়নি। এ অনিয়মের নির্বাচনে জাতি নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করবে না। এ ঘটনায় দেশে গণবিস্ফোরণ ঘটবে।’
‘রাতেই কাম শেষ’
ভোটের আগের রাতেই অনেক কেন্দ্রে “নৌকা” প্রতীকে সিল মেরে বাক্স ভর্তি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিভিন্ন মাধ্যমে এ সংক্রান্ত ছবিও পাওয়া গেছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম বিবিসি’র ওয়েব সাইটে একটি চিত্র দিয়ে বলা হয়েছে, রাতে ব্যালট বাক্স ভর্তি করে রাখার চিত্র দেখেছেন বিবিসির সাংবাদিক। তাতে ক্যাপশনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে বন্দর নগরী চট্টগ্রাম-১০ আসনের শহীদ নগর সিটি কর্পোরেশন বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি কেন্দ্রে গিয়ে সকালে ভোটগ্রহণের আগে ব্যালটবাক্স ভরা দেখলেন বিবিসি সংবাদদাতা।
এদিকে সাংবাদিকরা সরেজমিন গিয়ে দেখা বর্ণনায় বলা হয়, সকাল ৯টা, ঢাকা-৫ আসনের জনতাবাগ উচ্চ বিদ্যালয় কেন্দ্র। ভোটারদের লাইন নেই। একজন একজন করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছেন। কেন্দ্রের দ্বিতীয় তলায় পুরুষদের ভোট। ৩নং বুথে গিয়ে দেখা গেছে, ২ জন এজেন্ট। একজন হাত পাখার প্রার্থীর। অন্যজন নৌকার। পোলিং অফিসার ২ জন।
সহ-প্রিজাইডিং অফিসার একজন। নৌকার এজেন্ট ভোটারদের হাত থেকে ব্যালট পেপার নিয়ে নিজেই সিল মারছেন প্রকাশ্যে। এ ব্যাপারে সহকারী প্রিজাইডিং অফিসার মোতাহের হোসেনকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, এভাবেই চলছে।
হাতপাখার এজেন্ট জানালেন, আমরা ২ জন ছাড়া আর কোনো এজেন্ট আসেনি। কেন্দ্রে দায়িত্বরত পুলিশ ও আওয়ামী লীগ নেতারা খোশগল্পে মত্ত। একজন আওয়ামী লীগ নেতা চিৎকার করে বলছেন, ডানপাশের ওরা বিএনপি। ওদেরকে তাড়িয়ে দে। আরেক নেতা বলছেন, তাড়িয়ে লাভ কী। কাম তো রাতেই শেষ।
ভোট দিতে পারেনি ভোটাররা
শাহজাহানপুরে মির্জা আব্বাস ডিগ্রি কলেজে (ঢাকা-৮) কেন্দ্রে সকাল নয়টার দিকে একপাশে নারীরা আরেকপাশে পুরুষেরা ভোট দিচ্ছিলেন। এ সময় ভোটার আইডি কার্ড নিয়ে ঘুরছিলেন কয়েকজন। তাঁরা অভিযোগ করছিলেন তাঁদের ভোটার নম্বর দেয়ার কেউ নেই তাই ভোট দিতে পারছেন না। সময় গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে এই সংখ্যা বাড়তে থাকল। ছোট জটলা থেকে বড় হতে লাগলে ভোট দিতে না পারা মানুষের সংখ্যা।
এই দলেই নিজের ভোটার কার্ড নিয়ে চিৎকার করছিলেন রোকেয়া কবির লাভলি নামের এক মধ্য বয়স্ক নারী। কাছে যেতেই চিৎকার করে বলা শুরু করলেন, ‘আমি অসুস্থ মানুষ। ভোট দিতে আসছি। কিন্তু ভোট দিতে পারি নাই। দুই ঘণ্টা ধরে এইখানে সেইখানে ঘুরতেছি। একজন বলে ভেতরে যান। ভেতরে গেলে আরেকজন বলে বাইরে থেকে স্লিপ আনেন। বাইরে আসলে দেখি স্লিপ নাই। আমি এখন কার কাছে যাব। তাহলে কি ভোট দিতে পারব না? এর বিচার কে করবে?’ কথা বলার একপর্যায়ে কেঁদে ফেলেন রোকেয়া। কাঁদতে কাঁদতে তিনি চলে যান।
গণমাধ্যমের কর্মীদের দেখে অনেকের মতো এগিয়ে আসেন নারগিস আক্তার নামের আরেক নারী। তিনিও একই অভিযোগ করে বলেন, ভোট দিবার পারি নাই। প্রধানমন্ত্রী বলছেন সবাই ভোট দেবেন আমিও তাই ভোট দিতে আসলাম। এখন শুনি আমার ভোট কোথায় তা এখানকার লোকজন জানেন না।
এভাবে যখন কথা বলছিলেন নারগিস তখন প্রায় শতাধিক নারী ও পুরুষ কলেজের মাঠে ভোটার কার্ড উঁচিয়ে ভোট দেয়ার জন্য চিৎকার করছিলেন। একপর্যায়ে গণমাধ্যম কর্মীদের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে তারা মাঠে সমবেত হন। শিহাব উদ্দিন ও আনোয়ারা বেগম এসেছিলেন এই কেন্দ্রে ভোট দিতে। ভোটার নম্বর জানতে না পেরে ভোট দিতে না পেরে ভোট কেন্দ্রে দায়িত্বরতদের পেছনে পেছনে ধরনা দিতে থাকেন। একপর্যায়ে অধৈয্য হয়ে চিৎকার করতে থাকেন। বয়স জানতে চাইলে শিহাব উদ্দিন বলেন, আমার বয়স ৬০ বছর। এই জীবনে যতবার ভোট হইছে আমি দিছি। আর আজকো ভোট না দিয়া ফিরত যামু এ কেমন কথা? ভোট দিতে না পারলে এখানেই থাকমু দেখি কি হয়।
এই কেন্দ্রে ভোট দিয়েছেন এমন কয়েকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, সকালে ভোট শুরুর সময় কেন্দ্রের সামনে কিছু ব্যক্তি টেবিল চেয়ার নিয়ে বসেছিলেন। তাঁরা ভোটারদের ভোটার নম্বরের স্লিপ দিচ্ছিলেন। কিন্তু ঘণ্টা খানেকপর তাদের সেখান থেকে তুলে দেওয়া হয়। এতেই বিপাকে পড়েন সাধারণ ভোটাররা।
এখানে কথা হয় মো. বাচ্চু, তাজ উদ্দিনের সঙ্গে। তাঁরাও ভোট দিতে এসে তাঁদের ভোটার নম্বর না পেয়ে ভোটার কার্ড দেখিয়ে প্রতিবাদ করছিলেন। একপর্যায়ে এই কেন্দ্রে আসেন এই আসনে বিএনপি প্রার্থী মির্জা আব্বাস ও তাঁর স্ত্রী অফরোজা আব্বাস। তাঁরা দুজনই এই কেন্দ্রের ভোটার। তাঁদের সামনে পেয়ে অনেকে ভোট না দিতে পাররা অভিযোগ করছিলেন। এ সময় মির্জা আব্বাস ও আফরোজা আব্বাস প্রিজাইডিং কর্মকর্তার কার্যালয়ে এসে সমস্যার কথা তুলে ধরেন। সেই কক্ষ থেকে বেরিয়ে এসে বলেন, আমাদের কর্মীরা ভোট দিতে পারছেন না। এই প্রতিবাদে আমরা ভোট দেব না। আমরা এভাবেই চলে যাচ্ছি। মির্জা আব্বাস অভিযোগ করেন, আমাদের সমর্থকদের অনেকে ভোট দিতে এসে দেখেন ভোট দেওয়া হয়ে গেছে। আমি চাই আমারও ভোটটা কেউ দিয়ে দিক। আমি ভোট না দিয়ে ফিরে যাচ্ছি। এটি প্রহসনের নির্বাচন অভিযোগ করে মির্জা আব্বাস বলেন, নির্বাচন কমিশন চোখ বন্ধ করে রেখেছে। এই কমিশন বোবা ও কালা।
এই কেন্দ্রের প্রিসাইডিং অফিসার তুহিনুল ইসলাম বলেন, এই কেন্দ্রের ভোটার ২২৭০ জন। যারা ভোটারদের স্লিপ দিচ্ছিলেন তাঁরা না থাকায় কিছুটা জটিলতা তৈরি হচ্ছে। তারপরও আমরা ভোটারদের ভোটার নম্বর খুঁজে দিচ্ছি। কেউ ভোট না দিয়ে ফিরে যাচ্ছেন এই অভিযোগ ঠিক নয়। তিনি যখন এসব কথা বলছিলেন তাঁর সামনেই ভোট দিতে না পারা ভোটাররা বিক্ষোভ করছিলেন।
গতকাল বিকেল ৩টা ৫০ মিনিটের দিকে মিরপুর গার্লস আইডিয়াল ল্যাবরেটরী স্কুলে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয়ের মূলগেট বন্ধ করে দিয়ে ভোটারদের ঢুকতে দেয়া হচ্ছে না। গেটের দায়িত্বে থাকা আনসারকে জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেন, ভেতরে লাইন। সময় শেষ, এখন আর কোন ভোটারকে ঢুকতে না দেয়ার নির্দেশনা রয়েছে। ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, লাইনে দাড়িয়ে কিছু সংখ্যক লোক বিভিন্ন ভোটার নাম্বার নিয়ে ভোট প্রদান করছে। তাদেরকে কেউ চিহ্নিতও করছে না, তারা বৈধ ভোটার কি না? এমন কী একজন লোকই একাধিকার ভোট দিয়েছেন। এ কেন্দ্রে নৌকার এজেন্ট ছাড়া আর কাউকে দেখা যায়নি।
একাদশ জতীয় সংসদ নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসনের মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল স্কুল এন্ড কলেজ কেন্দ্রে সকাল ৮টা থেকে ভোট গ্রহণ শুরু হয়। সকাল ৯টা পর্যন্ত কেন্দ্রটিতে মাত্র ৩২ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে।
গতকাল রোববার সরেজমিন ঘুরে ভোটের এমন চিত্র দেখা যায়। কেন্দ্রটিতে পাঁচটি বুথের মাধ্যমে ভোট নেয়ার কার্যক্রম শুরু হয়। সকাল ৯টায় গিয়ে দেখা যায় ১নম্বর বুথে এক ঘন্টায় মাত্র ৮জন ভোটার ভোট দেয়। ২ নম্বর বুথেও ভোট দেয় ৮জন ভোটার। ৩নম্বর বুথে ভোট পড়ে ৬টি। ৪নম্বর বুথে ভোট দেয় ৬ জন। ৫ নম্বর বুথে ৪ জন ভোটার তাদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে। সবমিলে পাঁচটি বুথে এক ঘন্টায় মাত্র ৩২ জন ভোটার ভোট দেয়।
ভোটারের উপস্থিতি ছিল খুবই কম। ভোটারদের লাইনের কোনো বালাই ছিলো না। অনেকক্ষণ পর পর একজন করে ভোটার আসে। বুথগুলোতেও ছিল না ভোটারদের চাপ। ফলে সহকারি প্রিজাইডিং অফিসার ও পোলিং অফিসারদের কাজহীন সময় পার করতে দেখা যায়। ভোটারদের কম উপস্থিতির ব্যাপারে সহকারি প্রিজাইডিং অফিসাররা বলেন, আমরা যথা সময়ে ভোট গ্রহণের কার্যক্রম শুরু করেছি। হয়তো শীতের সকালের কারণে ভোটাদের উপস্থিতি কম।
প্রত্যেকটি বুথেই ছিলো নৌকার এজেন্টরা। ১১ জন প্রার্থীর ছবি সম্বলিত ব্যালট প্যাপার থাকলেও সরকারি দল বাদে অন্য কোনো দলের এজেন্টদের দেখা মেলেনি। পোলিং এজেন্টদের না আসার ব্যাপারে জানতে চাইলে সহকারি প্রিজাইডিং অফিসারা বলেন, কেন এজেন্টরা আসেনি সেটা নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী দলের ব্যাপার। আমাদের কাজ হলো সুষ্ঠু নির্বাচনের জন্য কাজ করা। সে দায়িত্ব আমরা পালন করছি।
ভোটের সার্বিক বিষয় নিয়ে কেন্দ্রটির দায়িত্বে থাকা প্রিজাইডিং অফিসার মো: মাহমুদুল হাসান বলেন, আমার দায়িত্বে থাকা ৬১ নম্বর কেন্দ্রে সকাল থেকেই সুষ্ঠু নির্বাচন হচ্ছে। ভোটারদের উপস্থিতি কম কেন জানতে চাইলে তিনি বলেন, শীতের সকালের কারণেই হয়তো ভোটারদের উপস্থিতি কম হতে পারে। বিরোধী দলের এজেন্ট না থাকার ব্যাপারে তিনি বলেন, আসেনি হয়তো কিছু সময়ের মধ্যে চলে আসবে। এ ছাড়া ভোট শান্তিপূর্ণই হচ্ছে।
খুলনা সিটি কর্পোরেশনের (কেসিসি) সাবেক সংরক্ষিত কাউন্সিলর রাবেয়া ফাহিদ হাসনা হেনার বাড়িতে হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। শনিবার রাতে তার দু’টি বাড়িতেই হামলা চালায়। হামলায় লক্ষাধিক টাকার ক্ষতি হয় বলে জানান তিনি। এ সময় তার বাসার টিভি, ফার্নিচারসহ বিভিন্ন আসবাবপত্র ভাংচুর করে। তবে তিনি ও তার পরিবারের অন্য সদস্যরা অক্ষত আছে।
রাবেয়া ফাহিদ হাসনা হেনা বলেন, সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার দিকে পুলিশ পরিচয় দিয়ে দরজার কলিংবেল টিপে ৭ থেকে ৮ জন। দরজা খুলতেই ৪ জন ঘরের ভেতরে এলোপাতাড়ি ঢুকে হামলা চালায়। সোফা, এলইডি টিভি ভেঙে ফেলে একটি তাক ও বিভিন্ন আসবাবপত্র ভেঙে চুরমার করে। পড়ে আামরা চিৎকার করলে আশে পাশের মানুষ আসলে তারা হুমকি ও গালিগালাজ করতে করতে বেরিয়ে যায়। কিছুক্ষণের মধ্যে শুনতে পাই বয়রা মেইন রোডে আমার নিজস্ব বাসায়ও দুর্বৃত্তরা হামলা চালায়। ঐ বাসায় থাই গ্লাস ভাঙচুর করে তবে বাসার ভেতরে ঢুকতে পারেনি।
এ ব্যাপারে সোনাডাঙ্গা মডেল থানার ওসি মো. মমতাজুল হক এর সরকারি মোবাইলে একাধিকবার ফোন দিলে রিসিভ হয়নি।
খুলনায় অধিকাংশ ভোট কেন্দ্র আওয়ামী লীগ দলীয় প্রার্থীদের কর্মী-সমর্থকদের দখলে ছিল। বেশিরভাগ কেন্দ্রেই বিএনপি’র প্রার্থীদের পোলিং এজেন্ট ছিল না। সেসব কেন্দ্র সকাল থেকেই ভোটারদের নৌকা প্রতীকের পোলিং এজেন্টদের সামনে ভোটারদের ভোট দিতে হয়েছে। ধানের শীষে ভোট দিতে পারেন, এমন ভোটারদের কেন্দ্রে ঢুকতে দেয়া হয় নি। কোথাও-কোথাও ব্যালট পেপোর কেড়ে নিয়ে সিল মারা হয়েছে। বিভিন্ন স্থানের ভুক্তভোগী ভোটাররা এসব অভিযোগ করেছেন।

নির্বাচনী সহিংসতায় ২১ জন নিহত 

দেশজুড়ে নির্বাচনী সহিংসতায় অন্তত ২১ জন নিহত হয়েছেন। গতকাল নির্বাচনের ভোটগ্রহণ চলাকালে প্রতিপক্ষের হামলা, পুলিশের গুলিতে তাদের মৃত্যু হয়। নিহতদের মধ্যে রাজশাহীর মোহনপুর ও গোদাগাড়ীতে আওয়ামী লীগের ২ কর্মী,  নাটোরের নলডাঙায় আওয়ামী লীগ কর্মী,  রাঙ্গামাটিতে যুবলীগ কর্মী, কক্সবাজারের পেকুয়ায় নৌকার সমর্থক, কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম ও    চান্দিনায় বিএনপির ২ কর্মী, চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে জাতীয় পার্টির কর্মী, পটিয়ায় ছাত্রসেনা ও যুবলীগ কর্মী, টাঙ্গাইলের গোপালপুরে বিএনপির এক কর্মী, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক যুবক, বগুড়ার কাহালুতে আওয়ামী লীগ কর্মী, নরসিংদীতে আওয়ামী লীগ কর্মী, সিলেটের বালাগঞ্জে ছাত্রদল নেতা,  লক্ষ্মীপুরের দত্তপাড়ায় এক যুবক, গাজীপুরে আওয়ামী লীগ কর্মী, নোয়াখালীতে আনসার সদস্য, যশোরে বিএনপির কর্মী, লালমনিরহাটে এক যুবক এবং সিরাজগঞ্জে আওয়ামী লীগ কর্মীর মৃত্যু হয়েছে। ভোটের আগের রাত থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে।

Related Post