কোম্পানীগঞ্জ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনে দ্বিধাবিভক্ত

December 09, 2019 12:12:PM

সোহেল মাহমুদ: কোম্পানীগঞ্জ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশন ইউএসএর কার্যনির্বাহী কমিটির নির্বাচনকে কেন্দ্র করে দ্বিধাবিভক্ত সংগঠনের সদস্যরা। সংগঠনের ১৫ সদস্যের কার্যনির্বাহী কমিটির আটজন সভাপতি আবদুল মালেকের এবং সাতজন সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেনের (সবুজ) পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। শুধু কমিটির সদস্যরা নয়, নির্বাচনকে কেন্দ্র করে সমিতির প্রবীণ সদস্যদের অনেকে বিভক্ত। এ কারণে অ্যাসোসিয়েশনের পূর্বঘোষিত ১০ নভেম্বরের নির্বাচনও স্থগিত হয়ে গেছে। কবে নাগাদ এই নির্বাচন হবে, সে বিষয়ে কার্যনির্বাহী কমিটি, নির্বাচন কমিশন কিংবা ট্রাস্টি বোর্ডের কেউই কিছু জানেন না।
অ্যাসোসিয়েশনের বিরোধ প্রকাশ্যে আসে নির্বাচনের মনোনয়নপত্র বিক্রির দিন গত ১০ অক্টোবর। সে রাতে নির্বাচনী তফসিল পরিবর্তনের অভিযোগ উঠে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে। একই রাতে নির্বাচন স্থগিতের ঘোষণাও আসে। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, মনোনয়নপত্র কিনতে আসা নুর আলম ছিদ্দিক (মুন্না) ও মোশারফ হোসেনের (সবুজ) সমর্থকেরা হট্টগোল ও বিশৃঙ্খল

পরিস্থিতি সৃষ্টি করে তাদের নির্বাচন স্থগিতে বাধ্য করা হয়।

নির্বাচন স্থগিতের পর থেকে অ্যাসোসিয়েশনের কার্যনির্বাহী কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদককে ঘিরে চলছে বিভক্তির মহড়া। দুই পক্ষ একের পর এক সভা আর সংবাদ সম্মেলন করে একে অন্যের বিরুদ্ধে বিষোদ্‌গার করছে। সাধারণ সম্পাদকের পক্ষের দাবি, নির্বাচন কমিশন আর ট্রাস্টি বোর্ড পক্ষপাতদুষ্ট। সাধারণ সম্পাদকের বিরুদ্ধে আবার ট্রাস্টি বোর্ডের ক্ষমতা দুই বছরে সীমিত করে গঠনতন্ত্র সংশোধনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এমন নানা অভিযোগ আর পাল্টা অভিযোগের মধ্যে সবশেষ ২৬ নভেম্বর রাতে কার্যকরী কমিটির সভাকে ঘিরে আরেক দফা সদস্যদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা দেয়।
৬১ চার্চ অ্যাভিনিউতে ২৬ নভেম্বর অ্যাসোসিয়েশনের কার্যালয়ে সভা আহ্বান করেন সভাপতি আবদুল মালেক। নির্বাচন বিষয়ে ট্রাস্টি বোর্ডের সবশেষ সিদ্ধান্ত নিয়ে আলোচনার জন্য এই সভা ডাকা হয় বলে দাবি করেন তিনি। এর আগে, ২০ নভেম্বর এক বৈঠকে ট্রাস্টি বোর্ড নির্বাচন আয়োজনে কিছু সিদ্ধান্ত নেয়। এর মধ্যে রয়েছে, নির্বাচন কমিশনের প্রথম বৈঠকে অনুমোদিত তফসিল অনুযায়ী ভোটগ্রহণ, নির্বাচন কমিশনকে সহায়তা করতে ট্রাস্টি বোর্ডের তিন সদস্যকে কমিশনে সংযুক্তকরণ, কিছু বিধিনিষেধ আরোপের মাধ্যমে নিউইয়র্ক নগরের বাইরে বিভিন্ন স্টেট ও সিটির ভোটারদের মেইলে ভোটাধিকার বহাল রাখা এবং ভোটার তালিকায় অনিয়ম তদন্তে ৪ সদস্যের কমিটি গঠন। এসব সিদ্ধান্তের ওপর আলোচনার জন্য ২৬ নভেম্বর রাতে সভাপতির ডাকে সভা বসে। সভার জন্য সংগঠনের কার্যালয় খোলা নিয়ে শুরু বিতর্কের।
সভাপতির পক্ষ দাবি করছে, পূর্ব নির্ধারিত সভা করতে এসে তাঁরা দেখেন, সমিতির কার্যালয়ে নতুন তালা ঝুলছে। সাধারণ সম্পাদককে বারবার ফোন করে না পেয়ে একপর্যায়ে তারা তালা ভেঙে ভেতরে ঢুকে সভা করেন। সভায় উপস্থিত সবাই ট্রাস্টি বোর্ডের সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার ব্যাপারে একমত হন। সভা শেষে তারা কার্যালয়ে নতুন তালা লাগান। সভাপতি আবদুল মালেক অভিযোগ করেন, তিনি সভা করতে অ্যাসোসিয়েশনের অফিসে যেন ঢুকতে না পারেন, সে জন্য সাধারণ সম্পাদক পুরোনো তালা পাল্টে ফেলেন।
এদিকে, কার্যালয়ের তালা ভেঙে ফেলার খবর পেয়ে ওই দিন মধ্যরাতে ঘটনাস্থলে আসেন সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন। তিনি দাবি করেন, সভাপতির ডাকা সভা মঙ্গলবারের (২৬ নভেম্বর) বদলে পরের রোববার করার অনুরোধ করেছিলেন তাঁরা। কিন্তু তাদের অনুরোধ না রাখা ও অ্যাসোসিয়েশনের কার্যালয়ের তালা ভাঙায় তাঁরা মর্মাহত। তালা ভাঙার কারণে অফিস ও সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ কাগজপত্র খোয়া যেতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনরি।
মোশারফ বলেন, এ ঘটনা প্রমাণ করে, একটি মহল কোম্পানীগঞ্জ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনকে ধ্বংস করার পাঁয়তারা করছে। সেই ষড়যন্ত্রের অংশীদার হয়েছেন ট্রাস্টি বোর্ডের সভাপতিসহ কিছু সদস্য ও নির্বাচন কমিশন।
সমিতির বেশ কিছু সদস্যের অভিযোগ, সম্প্রীতির জন্য এক সময়ের আলোচিত কোম্পানীগঞ্জ ওয়েলফেয়ার অ্যাসোসিয়েশনের নেতৃত্বে বিরোধের মূলে রয়েছে বাড়ি কেনা। সাধারণ সম্পাদক মোশারফ হোসেন অ্যাসোসিয়েশনের জন্য নিজের খেয়ালখুশি মতো একটি বাড়ি কিনেছেন। সভাপতির অনুসারীদের অভিযোগ, বাড়িটি বাজারমূলের চেয়ে বেশি দামে কেনা হয়েছে।
তবে মোশারফ বলছেন, তিনি, সভাপতি ও কার্যনির্বাহী কমিটির সিদ্ধান্তেই বাড়িটি কেনা হয়েঠে। কার্যনির্বাহী কমিটির প্রচার সম্পাদক মোহাম্মদ সালাউদ্দিন অভিযোগ করেন, কার্যনির্বাহী কমিটিতে বাড়ি কেনার বিষয়ে কথা হলেও সাধারণ সম্পাদক যে প্রক্রিয়ায় বাড়ি কিনেছেন, তাতে অনিয়ম হয়েছে। তিনি ও তাঁর অনুসারী কার্যনির্বাহী কমিটির কোষাধ্যক্ষ মিলে সমিতির সাধারণ সদস্যদের অর্থের নয়ছয় করেছেন।
অ্যাসোসিয়েশনের কোন কোন সদস্য মনে করেন, এই বাড়ি কেনা নিয়েই সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের মধ্যে বিরোধ। অথচ এর আগে ২০১৮ সালে সাধারণ সভায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক সদস্য উপস্থিত না থাকার পরও গঠনতন্ত্রকে পাশ কাটিয়ে মালেক-মোশারফের নেতৃত্বাধীন বর্তমান কার্যনির্বাহী কমিটি নিউইয়র্ক নগরের বাইরে বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য ও নগরে বসবাসরত ভোটারদের ডাকযোগে ভোট দেওয়ার সুযোগ বাতিল করে। এখন সেই কমিটিরই একটি অংশ আবার সেই পদ্ধতি ফিরিয়ে আনার দাবি তুলছেন।
সভাপতিবিরোধী পক্ষের সংবাদ সম্মেলন
এর আগে, ২৫ নভেম্বর সন্ধ্যায় ব্রুকলিনের কেনসিংটনে এক সংবাদ সম্মেলনে নুর আলম-মোশারফের অনুসারীরা ১৫ দিনের মধ্যে সাধারণ সভা ডেকে নির্বাচন কমিশন ও ট্রাস্ট্রি বোর্ড পুনর্গঠনের দাবি জানান। তাঁরা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, অ্যাসোসিয়েশনের কার্যনির্বাহী কমিটি যদি তাদের দাবি মানতে ব্যর্থ হয়, তাহলে তারা তলবি সভা ডেকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবেন।
চার্চ ম্যাকডোনাল্ড অ্যাভিনিউয়ে স্থানীয় একটি রেস্টুরেন্টে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন স্থগিত নির্বাচনে বর্তমান সভাপতির বিরোধী পক্ষের প্যানেল মুন্না-সবুজ পরিষদের নির্বাচনী পরিচালনা কমিটির প্রধান জহির উদ্দিন। তিনি দাবি করেন, নির্বাচন কমিশনসহ একটি ‘কর্তৃত্ববাদী সিন্ডিকেট’ নানা কৌশলে অ্যাসোসিয়েশনের নির্বাচন প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করেছে। নির্বাচনী তফসিল পরিবর্তন করে নির্বাচন কমিশন নিউইয়র্ক নগরের বাইরের ভোটারদের ভোট ডাকযোগে পাঠানোর পদ্ধতিকে পুনর্বহাল করেন, যা ইতিপূর্বে সাধারণ সভায় বাতিল করা হয়।
সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করা হয়, সোসাইটির গঠনতন্ত্র অনুযায়ী যেকোনো সংকটকালে ট্রাস্টি বোর্ড প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য দায়িত্বপ্রাপ্ত হলেও তারা সেটি না করে একটি মহলের পক্ষাবলম্বন করেছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়া বানচাল করে সোসাইটির ক্ষমতা নিজেদের হাতে নেওয়ার ষড়যন্ত্র করছে ট্রাস্টি বোর্ড।
সংবাদ সম্মেলনে অন্যান্যের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন গোলাম ছারোয়ার, আল হারুন, শাহ আলম, মোহাম্মদ মোজাম্মেল হোসেন, আবুল খায়ের, আবু সুফিয়ান, মোহাম্মদ নুরুল করিম মোল্লা, জাহাঙ্গীর আলম, নাঈম টুটুল প্রমুখ।

Related Post