অর্ধশত বছরেও সাঁকোটি সেতু হয়নি

মার্চ ১৫, ২০১৭ ১১:০৩:অপরাহ্ণ

নিজস্ব প্রতিবেদক: সাঁকোটি নির্মাণের ইতোমধ্যে অর্ধশতাধিক বছর পেরিয়ে গেছে। কতোবার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে এখানে ব্রিজ হবে কিন্তু তাও হয়নি। নোয়াখালী সদর উপজেলার পূর্ব চরমটুয়া ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডে খোয়ারখালের উপর চাপরাশি বাড়ির বাঁশের সাঁকোটির এমন হাল। ফলে পার্শ্ববতী জেলা লক্ষ্মীপুরের সীমান্তবর্তী ভবানীগঞ্জ ও ওই ইউনিয়নের পশ্চিম চরমটুয়া গ্রামের কয়েক হাজার মানুষকে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ সাঁকো দিয়ে চলাচল করতে গিয়ে স্কুল-কলেজের ছাত্র-ছাত্রী ও পথচারিরা বিভিন্ন সময় দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। অপর দিকে পশ্চিম চরমটুয়া গ্রামের মানুষগুলোর উৎপাদিত ধানসহ কৃষিপন্য বাজারজাত করতে দুর্ভোগের পাশাপাশি আর্থিক লোকসান গুণতে হচ্ছে।
সরেজমিনে গেলে স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, সদরের খোয়ার খালের উপর চাপরাশি বাড়ির বাঁশের সাঁকোটির পশ্চিম অংশে উপজেলার পূর্ব চরমটুয়া ইউনিয়নের পশ্চিম চরমটুয়া গ্রাম। আর এই গ্রামের পশ্চিমে লক্ষ্মীপুর জেলার সীমান্তবর্তী কুশাখালী ইউনিয়নের ভবানিগঞ্জ। শত বছর পূর্বে ভুলুয়া নদীর গর্ভ থেকে এ অঞ্চল জেগে উঠে। নদীটি সরে যায় পূর্ব দিকে। থেকে যায় ভুলুয়ার ছরি। পরে এর নাম করণ করা হয় খোয়ার খাল। তৎকালীন সময় খোয়ারখালের দুই পাড়ের বাসিন্দারা নৌকায় পারাপার করতো। পর্যায়ক্রমে খালের দুই পাড়সহ আশপাশে মানুষের বসতি বাড়তে থাকে। প্রয়োজনের তাগিতে বসতির পাশাপাশি দুই পাড়ে যাতায়াতের জন্য অসংখ্য পথ (কাঁচা সড়ক) তৈরি হয়। এতে সরু হয়ে পড়ে খোয়ার খালটি। এক পর্যায়ে ওই খালের উপর দিয়ে বাঁশের সাঁকো নির্মাণ করে খালের পশ্চিম পাড়ের মানুষ নোয়াখালী সদরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যাতায়াত শুরু করে। এভাবে সাঁকো দিয়েই যাতায়াত করছে অর্ধশত বছরের মতো।
বাসিন্দারা জানান, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন হয়েছে। কাঁচা সড়ক থেকে সলিং। এর পর পাকা সড়ক হয়েছে অসংখ্য। কিন্তু দীর্ঘ অর্ধশত বছরেও খালটির উপর নির্মিত সাঁকোটি পাকা সেতুতে পরিণত হয়নি।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধির ভাষ্য অনুযায়ী- শুধু পশ্চিম চরমটুয়া গ্রামেই বসবাস করছে তিন হাজারেরও বেশি পরিবার। এখানে তিনটি ফসল উৎপাদিত হচ্ছে। আউশ, আমন ধান ও রবিশস্য। কিন্তু ওই অঞ্চলে বড় কোনো বাজার না থাকায় এবং সরাসরি জেলা সদরের সাথে ভালো যোগাযোগ ব্যবস্থা না থাকায় উৎপাদিত কৃষিপন্য বাজারজাত করতে গিয়ে বিপাকে পড়তে হয় কৃষকদের। এ ছাড়া স্কুল-কলেজ না থাকায় ওই গ্রামের মানুষগুলো সাঁকোটি হয়ে আসতে হচ্ছে মূল ইউনিয়নে। প্রতিদিন কয়েক শত স্কুল-কলেজগামী ছাত্র-ছাত্রী সাঁকো দিয়ে যাচ্ছে আবুয়া ডগি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে, ফানা মিয়া উচ্চ বিদ্যালয়, আবদুল মালেক উকিল (চরমটুয়া) ডিগ্রি কলেজে, মজিবুল হক দাখিল মাদ্রাসায়। স্থানীয় বাসিন্দারা সাঁকো হয়ে স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ, সদর পশ্চিমাঞ্চলের বড় বাজার ‘চরমটুয়া বাজার’ এবং নোয়াখালী জেলা সদর দপ্তরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে। পশ্চিম চরমটুয়া গ্রাম ছাড়াও লক্ষ্মীপুর সীমানার কুশাখালি ইউনিয়নের পুকুর দিয়া ও ভবানিগঞ্জ এলাকার মানুষও সাঁকো দিয়ে যাতায়াত করছেন। এ সাঁকোর ব্যবহার করছে অন্তত ৭-৮ হাজার বাসিন্দা।
আবুয়া ডগি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র মিরাজ বলেন, বর্ষায় স্কুলে যেতে বেশি কষ্ট হয়। বড়রা কেউ সাথে থাকলে কোলে নিয়ে সাঁকো পার করে। এখনতো খালে পানি কম। এ কারণে সাঁকো খাল থেকে অনেক উপরে দেখা যায়। গত কয়েকদিন আগে পঞ্চম শ্রেণিতে পড়–য়া একটি ছাত্রী খালে পড়ে গেছে।
জসিম উদ্দিন নামে একজন বাসিন্দা জানান, প্রতিদিন সাঁকো হয়ে দুই পাশে সহ¯্রাধিক মানুষ যাতায়াত করে। সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়তে হয় স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের এবং কৃষকদের। এ অঞ্চলে তিনটি ফসল উৎপাদন হয়। আউশ, আমন ও রবি শস্য। সেতু না থাকায় খালের পশ্চিম পাশ থেকে কৃষকদের উৎপাদিত ফসল শ্রমিক দিয়েই পূর্ব পাড়ে আনতে হচ্ছে। এতে অতিরিক্ত শ্রমিক খচর দিতে গিয়ে আর্থিক লোকসানে পড়তে হচ্ছে। অনেক সময় শ্রমিকরা ফসলের বস্তা মাথায় নিয়ে যাতায়াত কারকালীন খালে পড়ে যাচ্ছেন। এমন ঘটনা অহরহ হচ্ছে। এক কথায় সীমাহীন দুর্ভোগে এ অঞ্চলের মানুষ।
জনপ্রতিনিধি ও স্থানীয় বাসিন্দারা দ্রুত সময়ের মধ্যে সাঁকোটির স্থলে পাকা সেতু নির্মাণের দাবী জানিয়েছেন। তারা বলছেন, সেতু নির্মাণ হলে এ অঞ্চলের শিক্ষার মান বেড়ে যাবে। একই সাথে আর্থিকভাবে আরো স্বচ্ছল হয়ে স্থানীয় বাসিন্দারা।
১৯নং পূর্ব চরমটুয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান নূর আলম স্থানীয়দের দুর্ভোগের বিষয়টি স্বীকার করে বলেন, চার যুগেরও বেশি এভাবে সাঁকো দিয়ে যাতায়াত করচ্ছে ৭-৮ হাজার বাসিন্দা। এ দুর্ভোগের স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান, সাংসদ, এলজিইডিসহ সংশ্লিষ্ট বিভাগে একাধিকবার ধরনা দিয়েছেন। তিনি জানান, ইতোমধ্যে এলজিইডি সয়েলটেস্ট ও সার্ভের কাজ শেষ করেছে।
দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের নোয়াখালী সদর উপজেলা কার্যালয়ের সহকারি প্রকৌশলী মো. আমিরুল ইসলাম বলেন, প্রাথমিক পর্যায়ের প্রায় সব কাজ শেষ। এখন ডিজাইনিংয়ের কাজ চলছে। আগামী এক মাসের মধ্যে ডিজাইনিং শেষ হওয়ার আশা করছেন তিনি।
তিনি বলেন, ডিজাইনিংয়ের কাজ শেষ হলেই সেতু নির্মাণের উদ্দেশ্যে টেন্ডারসহ অন্যান্য কাজগুলো করার প্রস্তুতি নেয়া হবে। সূত্র: চলমান নোয়াখালী

Related Post